জাতির
অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার খন্দকার শামসুল হক ১৯৪৪
খ্রিষ্টাব্দে টাঙ্গাইল জেলের মধুপুর উপজেলার জটাবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তার
পিতার নাম খন্দকার মোশারফ হোসেন ছিলেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী। তিনি সে সেসময়
সরকারি চাকরি পেলেও চাকরি না করে নিজ গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং
সেখানে শিক্ষকতা পেশায় আত্মনিয়োগ করেন এবং শিক্ষাসেবাকেই জীবনের ব্রত হিসাবে গ্রহন
করেন। খন্দকার শামসুল হকের মাতা ছিলেন একজন সুগৃহিনী।
শৈশব
কৈশোরের দুরন্তপনার কারণে খন্দকার শামসুল হকের শিক্ষা বেশিদুর এগোয়নি। তিনি ১৯৬৩
খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে পাক-ভারত
যুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানের শিয়ালকোট সেক্টরে অসম সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেন।পাক
বাহিনীতে কর্মরত থাকাকালীন বাংগালী সৈনিকদের প্রতি পাকিস্তান সরকার তথা পসচিম
পাকিস্তানীদের বঞ্চনা ও বৈষ্ম্যের ব্যাপারে তিনি মানসিকভাবে ক্ষুব্দ ছিলেন। এ
কারনে পাক বাহিনীর চাকরি ছেড়ে চলে আসেন।
সেই
সময় দেশে পাকিস্তান বিরোধী বাঙ্গালী জাতির গণ অভ্যত্থান জোরদার হয়ে উঠেছে। সে সময়
তিনি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে উজ্জিবীত হয়ে স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হন এবং
স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ করে এলাকার অবসরপ্রাপ্ত সৈনি আনসার ও বিভিন্ন
পেশার যুবকদের সংগঠিত করে সামরিক প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করেন। ২৫ মার্চ পাক বাহিনী
দেশব্যাপী গণহত্যা শুরু করলে তিনি মধুপুর এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজে
আত্মনিয়োগ করেন এবং সহযোগী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে পাক বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা
বিচ্ছিন্ন করার জন্য ব্রিজ ভেংগে ফেলেন। মধুপুরের বনাঞ্চলে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য
শক্তিশালী ঘাটি স্থাপন করেন। তন্মধ্যে আংগাইলা, মইশা, শাইনাবাড়ি ও শোলাকুড়ি নামক
স্থান উল্লেখযোগ্য। ১৪ এপ্রিল মধুপুরে পাক বাহিনীর সাথে সংগঠিত যুদ্ধে
মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে একজন মেজরসহ ১৫/২০ জন পাক সেনা নিহত হয় এবং তাদের কাছ থেকে
২টি গাড়ি ও বিপুল পরিমান গোলাবারুদ উদ্ধার হয়।এরপর মধুপুর গড়ের জংগলে
মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে গেরিলা আক্রমন শুরু করেন। তিনি মধুপুর, গোপালপুর,
মুক্তাগাছা, ফুলবাড়িয়া এবং জামালপুরের দক্ষিণ অঞ্চলের বিস্তীর্ন এলাকায় ততপরতা
জোরদার করেন। তিনি মুক্তাগাছা থানা, ফুলবাড়িয়া থানার কেশরগঞ্জ বাজার রাঙ্গামাটিতে
পাক বাহিনীর ক্যাম্প অপারেশন এবং টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কে চোরাগুপ্তা হামলায়
সক্রিয় অং শগ্রহন করেন। সে সময় তিনি পাক বাক বাহিনীর দোসর আল বদর, রাজাকার বাহিনীর
কাছে ভয়াবহ আতংকে পরিণত হন। এই আক্রোশে পাকবাহিনী তার বাড়ী জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার
করে দেন। এমন কি তার বৃদ্ব মাতাকে থানায় আটকে রাখেন।
মুক্তিযুদ্ধের
পর যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজে এলাকার উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপুর্ণ অবদান রাখেন।
তিনি ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে নিজ গ্রামের ডা. খন্দকার মতিউর রহমানের জৈষ্ঠ কন্যা সাবিহা
খানম শিউলির সাথে শুভ পরিণয়ে আবদ্ধ হন। তার দুই পুত্রের মধ্যে জৈষ্ঠ পুত্র খন্দকার
সাব্বির আহমদ স্নাতক ডিগ্রী লাভের পর ব্যবসায় সম্পৃক্ত এবং কনিষ্ঠ পুত্র খন্দকার
সিফাত অধ্য্যয়নরত।
বীর
মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার শামসুল হক ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দের আগষ্ট মাসে মত্যুবরণ করেন।
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীসহ টাঙ্গাইলের বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতিতে পূর্ণ
রাষ্ট্রীয় মর্জাদায় তাকে সমাহিত করা হয়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন