নবাব
বাহাদূর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুসলমান মন্ত্রী। ঢাকা
বিশ্ববিদ্যলয়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম একজন। ধনবাড়ীর জমিদার নবাব বাহাদূর
সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ছিলেন একজন ভাষা সৈনিক ও রাজনীতিক। তাহার জন্ম ১৮৬৩
খ্রিষ্টাব্দের ২৯ ডিসেম্বর। পিতার নাম জনাব আলী চৌধুরী, মাতার নাম সাইয়েদা রাবেয়া
খাতুন।
পিতার
মৃত্যুর পর নওয়াব আলী চৌধুরী নানার বাড়ি নাটোরে লালিত পালিত হন। তিনি রাজশাহী
কলেজিয়েট স্কুলে লেখাপড়া করেন কলকাতার বিখ্যাত সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে
কৃতিত্বের সাথে এফ এ পাস করেন। বাল্যকালে পিতৃবিয়োগ হওয়ায় জমিদারি পরিচালনার ভার
তার উপর ন্যস্ত হয়। এজন্য তার আর উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করা সম্ভব হয়নি।
নওয়াব
আলী চৌধুরী প্রথমে বিয়ে করেন বগুড়ার বিখ্যাত নবাব সৈয়দ আব্দুস সোবাহান চৌধুরীর
কন্যা আলতাফুন্নেসা চৌধুরাণীকে। এই ঘরে এক পুত্র আলতাফ চৌধুরী। প্রথম স্ত্রীর
মৃত্যুর পর কিশোরগঞ্জের নিকটস্থ জঙ্গলবাড়ীর জমিদার বিখ্যাত বার ভূইয়ার অন্যতম
ব্যক্তিত্ব ঈশা খাঁ মসনদে আলার বংশধর সাঈদা খাতুন চৌধুরাণীকে বিয়ে করেন। এই পক্ষে
কোন সন্তান ছিলোনা। দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যুর পর জঙ্গলবাড়ীর ছোট জমিদারারিরও মালিক
হন নওয়াব আলী চৌধুরী। তিনি তৃতীয়বার নবাব সৈয়দ আব্দুস সোবাহান চৌধুরীর চতুর্থ
কন্যা সৈয়দা সাকিনা খাতুনকে বিয়ে করেন। এই ঘরের দ্বিতীয় পুত্র নবাবজাদা সৈয়দ হাসান
আলী চৌধুরী ছিলেন বংগীয় আইন সভার সদস্য, ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রাদেশিক সরকারের
বাণিজ্যমন্ত্রী, ১৯৬২-১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে শিল্পমন্ত্রী এবং দেশ স্বাধীন হয়ার পর
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সদস্য ছিলেন। নওয়াব আলী চৌধুরীর পৌত্র (প্রথম পুত্র আলতাফ
চৌধুরীর প্রথম পুত্র) মোহাম্মদ আলী চৌধুরী যুক্ত বাংলার অর্থমন্ত্রী এবং
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেন। নওয়াব আলী চৌধুরীর
পৌত্রী (হাসান আলী চৌধুরীর একমাত্র কন্যা) আশিকা আকবর বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ছিলেন।
নবাব
নওয়াব আলী চৌধুরী একজন দানশীল, ন্যায়পরায়ণ ও শিক্ষানুরাগী জমিদার ছিলেন। সমাজসেবা
ও শিক্ষা বিস্তারে তার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশেষকরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠায় যে অসামান্য অবদান তিনি রেখে গেছেন, তা ইতিহাসের পাতায় উজ্জল হয়ে আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অবদান অনেকেরেই রয়েছে কিন্তু নওয়াব আলী চৌধুরীর মতো
এতো বেশি সক্রিয় অবদান আর কারো নেই। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি আদায়ে
অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। সেই ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ জানুয়ারী লর্ড হার্ডিঞ্জ
কতৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা হওয়ার পর থেকে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের ২৩
মার্চ, যেদিন বড় লাটের আইনসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক্ট পাস হয়, সেদিন পযন্ত এর
পেছনে নওয়াব আলী চৌধুরী চেষ্টার কোন বিরাম ছিলনা। তিনি প্রথম থেকেই উচ্চ কমিটি
ঢাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোর্টের চ্যান্সেলর কতৃক মনোনীত অন্যতম সদস্য ছিলেন।
শুরুর দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি তিন ছাত্রের জন্য বৃত্তি বাবদ ১৬ হাজার টাকার
একটি তহবিল তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করেন। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে ৩৫
হাজার টাকা দান করেন। খাজা মুহম্মদ আযম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় নওয়াব আলী
চৌধুরীর অবদানের কথা উল্লেখ করে বলেন-“তার প্রচেষ্টা না থাকলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
জন্মই হতোনা।“
শিক্ষাক্ষেত্রে
নওয়াব আলী চৌধুরীর অবদান এখানেই শেষ নয়, প্রায় চল্লিশটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
স্থাপনের জন্য তিনি জমি ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি তার
নিজস্ব এলাকা ধনবাড়ীতে ‘নওয়াব ইনস্টিটিউশন’ নামে একটি উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপন করেন।
সোনাতলা, কোদালিয়া, গফরগাঁও, পিংনা, জঙ্গলবাড়ী, হয়বতনগরসহ বিভিন্ন স্থানে শিক্ষা
প্রতিষ্ঠান স্থাপনে সহায়তা করেছেন। মন্ত্রী থাকাকালীন তিনি ঢাকা ও চুচুয়ায় সরকারি
কৃষিক্ষেত্র স্থাপন, বয়ন উচ্চবিদ্যালয়ের উন্নতি সাধন, ছাত্রবৃত্তি বৃদ্ধি কৃষি
শিক্ষা বিষয়ক প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং তাতীদের উপযোগী স্থায়ী ও সামযিক স্কুল
স্থাপনসহ অসংখ্য সমাজসেবামুলক কাজ করেন।
সাহিত্য
ও সংস্কৃতির প্রতি তার যথেষ্ট অনুরাগ বা ঝোক ছিল ছোটবেলা থেকেই। ১৮৯৫-১৯০৪
খ্রিষ্টাব্দ পরযন্ত ‘মিহির’ ও ‘সুধাকর’পত্রিকা একত্রিত হয়ে সাপ্তাহিক ‘মিহির ও
সুধাকর’ নামে যে পত্রিকাটি আত্মপ্রকাশ করেছিল, সেই পত্রিকার মালিক ছিলেন
তিনি।এজন্য একটি প্রেস ক্রয় করে কোলকাতার বাসায় স্থাপন করেন। স্ত্রী আলতাফুন্নেসার
নামানুসারে প্রেসটির নাম রাখেন ‘আলতাফী প্রেস’।‘প্রচারক’ ও ‘ইসলাম প্রচারক’
প্রকাশে তিনি আর্থিক সাহায্য এবং পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেন। বাংলা ভাষাবিদ ডক্টর
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তার ‘বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থটি নওয়াব আলী চৌধুরীর নামে
উতসর্গ করেন। এছাড়াও কবি কায়কোবাদ রচিত ‘মহাশ্মশান’ কাব্যের ১ম খন্ড(১৯০৪ খ্রিঃ),
পন্ডিত রেয়াজ উদ্দিন আহমদ আল মাশহাদীর ‘সুরিয়া বিজয়’ (১৩০২ বঙ্গঃ), নদীয়ার কবি দাদ
আলীর ‘সমাজ শিক্ষা’ (১৯১০ খ্রিঃ), নদীয়ার অপর কবি মোজাম্মেল হকের ‘জাতীয় ফোয়ারা’
(১৯১২ খ্রিঃ) নওয়াব আলী চৌধুরীর নামে উতসর্গ করেন।
নওয়াব
আলী চৌধুরী একজন সুলেখকও বটে। তিনি তার জীবদ্দশায় ‘ঈদুল আযহা’ (১৯০০ খ্রিঃ), ‘ভারনাকুলার
এডুকেশন ইন বাংলা’ (১৯০০ খ্রিঃ), ‘মৌলুদ শরীফ’ (১৯০৩ খ্রিঃ), এবং ‘এডুকেশন ইন
রুরাল এরিয়াস’ (১৯০৬ খ্রিঃ) গ্রন্থ রচনা করেন।
১৯০৫
খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় থেকে নওয়াব আলী চৌধুরী রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
তিনি একাধারে খাটি বাংগালী, খাটি মুসলমান ও সর্বভারতীয় ছিলেন। তার সমমনা এবং বিরোধী
রাজনীতিকদের মধ্যে তিনিই ছিলেন স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের অধিকারী। উর্দু ও ইংরেজি
সমর্থক নবাব আব্দুল লতিফ, স্যার সৈয়দ আমীর আলী নবাব সলিমুল্লাহর রাজনৈতিক অনুসারী
এবং বৃটিশভক্ত ছিলেন। নওয়াব আলী চৌধুরী উর্দূভাষী পরিবারের সন্তান হয়েও নিজস্ব ধ্যান
ধারণায় তিনি বিশ্বাসী ছিলেন বলেই বাংলা ভাষার পক্ষে কথা বলতে, জোরালো ভূমিকা নিতে
ভুল করেননি। ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে যখন ভারতের রাষ্ট্রভাষা কি হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে
শরীফ জাতের মুসলমানেরা উর্দুর পক্ষে, উচ্চবর্ণের হিন্দুরা হিন্দির পক্ষে অভিমত
ব্যক্ত করেন। ঠিক সেই সময়ে নওয়াব আলী চৌধুরী লিখিত প্রস্তাবের মাধ্যমে বৃটিশ
সরকারকে বলেছিলেন, “ ভারতের রাষ্ট্রভাষা যাই হোক, বাংলার রাষ্ট্রভাষা করতে
হবে-বাংলাকে”(ভাষা আন্দোলনের ডায়রী, মোস্তফা কামাল)।
তিনি পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক সভার সদস্য ছিলেন (১৯০৬-১৯১১ খ্রিঃ), বাংলা
প্রেসিডেন্সি ব্যবস্থাপক সভার সদস্য ছিলেন (১৯১২-১৯১৬ খ্রিঃ),ভারতীয় আইনসভার সদস্য
ছিলেন (১৯১৬-১৯২০ খ্রিঃ)। ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বংগীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত
হন এবং প্রথম রিফরমড কাউন্সিলে ১৯২১-১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দ পরযন্ত তিনি বেঙ্গল
এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য মনোনীত হন এবং মৃত্যুর পূর্ব পপর্যন্ত সে পদে বহাল
ছিলেন।
তিনি
তার কর্মময় জীবনে বহু সংগঠনের সাথে জ্যড়িত ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,
কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ছিলেন। বিভিন্ন
ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য বৃটিশ সরকার কতৃক ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে ‘খান
বাহাদুর’, ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে সি.আই.ই. ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে ‘নবাব’ এবং ১৯২৪
খ্রিষ্টাব্দে ‘নবাব বাহাদুর’ খেতাব লাভ করেন।
নওয়াব
আলী চৌধুরী ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ এপ্রিল দার্জিলিং-এ ‘ইডেন ক্যাসেল’ বাসভবনে
মৃত্যুবরণ করেন। ২০ এপ্রিল নিজ জমিদার বাড়ি এলাকায় তার নিজ হাতে গড়া বিখ্যাত জামে
মসজিদের অভ্যন্তরে ছোট একটি কক্ষে তাকে সমাহিত করা হয়।
তিনি
মরেও অমর হয়ে আছেন ধনবাড়ি-মধুপুর (টাংগাইল ওয়ান) তথা সারা বাংলাদেশের মানুষের
অন্তরে।
সৈয়দ
নওয়াব আলী চৌধুরীর মৃত্যু উপলক্ষে বংগীয় ব্যবস্থাপক সভায় বেঙ্গল গভর্ণর স্ট্যানলি
জ্যাকসন শোক প্রস্তাবে বলেছিলেন-“By this deth Bengal has lost True son of the
Mohammadan Community, an ardent and fearless parton.”

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন