মধুপুর নামকরণের ইতিহাস ও ঐতিহ্য


বাংলা শব্দ মধু হতে নামকরণ হয়েছে মধুপুর। বংশাই নাদীর তীরে অবস্থিত এই উপজেলায় মধুপুর গ্রামটি এক সময় ঘন-জঙ্গলে আবৃত ছিল।সেখানে প্রচুর মোমাছি থাকতো এবং প্রচুর মধু সংগ্রহ করা হতো। ধারণা করা হয় এজন্যই এই এলাকার নাম মধুপুর হয়।এই গ্রাম ছিল ফকির ও সন্যাসী আন্দোলনের ঘাটি। ব্রিটিশ রাজত্বে তারা অত্যাচারী জমিদার নীলকর ও ইংরেজদের বিরুদ্বে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। এই গ্রামেই মধুপুর ডিগ্রী কলেজ ও রাণী ভবানী পাইলট স্কুল স্থাপিত হয়।

রাণীবানী পাইলট স্কুলের মাঠ সংলগ্ন একটি জায়গায় ছিল সন্যাসীদের জমায়েত স্থল, যা আনন্দমঠ নামে পরিচিত (বর্তমানে সেখানে সরকারি খাদ্য গুদাম)।এই আনন্দমঠকে ঘিরেই বিখ্যাত বাংলা সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায় তার বিখ্যাত উপন্যাস “আনন্দমঠ” লিখেছিলেন। বংশাই নদীটি মধুপুর ও বোয়ালী গ্রামকে বিভক্ত করেছে। মধুপুর গ্রামের সেই আনন্দমঠ থেকে পাচশত গজ দীর্ঘ একটি সুড়ঙ্গ মধুপুর ডিগ্রী কলেজের নীচ দিয়ে বংশাই নদী পাড়ি দিয়ে বোয়ালী গ্রামে গিয়েছে। বোয়ালী গ্রামে সন্যাসীদের বাসভবন, মন্দির ও সুপ্রসশ্ত অট্রালিকা ছিল। সুড়ং পথে বংশাই নদী পাড়ি দিয়ে সন্যাসীরা যাতায়াত করতেন। পরবর্তীতে ব্রিটিশ সেনাদের আক্রমণে সন্যাসীরা পরাজিত হয়ে উচ্ছেদ হয়। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্থানি হানাদার বাহিনী কামান দেগে আনন্দমঠটি গুড়িয়ে দেয়। সুড়ঙ্গটি নিরপত্তার অভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়।

মধুপুর উপজেলার একটি গ্রামের নাম দূর্গাপুর, যার নাম ছিল দর্গাপুর। ১৯১১ খ্রিশটাব্দে হিন্দু জমিদারের কর্মচারীরা জরীপকারীদের প্রভাবিত করে দুর্গাপুর নামকরণ করে। এই গ্রামের উচু ভিটায় প্রাক-মুঘল স্থাপত্য কৌশলে নির্মিত একটী দরগা আছে, যা পাচ পীরের দরগা নামে পরিচিত। কথিত আছে সুলতানী আমলে পাচজন কামেল দরবেশ ইসলাম প্রচারের জন্য এসে এই গ্রামের একটি উচু ভিটার গাছতলায় থাকতেন। তাই উনাদের ইন্তেকালের পরে ঐ জায়গাতেই সমাহিত করা হয়। সমাধির উপর নির্মাণ করা হয় একটি ইমারত-যা পাচ পীরের দরগা হিসাবে খ্যাতি লাভ করে।

রসুলপুর গ্রামে আছে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ সূফী সাধক, হযরত জয়েনশাহী (রহঃ) মাজার। এই গ্রামেই আছে একটী অবলোকন টাওয়ার।
লহুরিয়াতে আছে প্রাকৃতিক চিড়িয়াখানা ও ।চিড়িয়াখানাতে বাঘসহ অনেক প্রাণী থাকলেও, বর্তমানে হরিণ প্রজনন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে এখানে।

এই উপজেলায় জলছত্র নামক স্থানে রয়েছে সুপরিচিত ৫০ শয্যা-বিশিষ্ট একটি কুষ্ঠ হাসপাতাল -যা জলছত্র কুষ্ঠ হাসপাতাল নামে পরিচিত। বেলজিয়ামের ড্যানিয়েল ফাউন্ডেশন কতৃক হাসপাতালটি পরিচালিত হয়।

ভারতীয় লোকসভার সাবেক স্পীকার পি এ সাংমার জন্মস্থান বুটিয়াতে। মধুপুরের টেলকি নামক স্থানে রয়েছে-বাংলাদেশ বিমান বাহিনীরপ্রশিক্ষণের জন্য ফায়ারিং রেঞ্জ।

পীরগাছা গ্রামে রয়েছে বিস্তৃত এলাকা নিয়ে সেন্ট পৌলস গীর্জা।

মধুপুরের সর্ব উত্তরের গ্রাম-শোলাকুড়ি। এখানে আছে প্রাচীন প্রাসাদ, একটই প্রাচীন বড় দীঘি ও ছোট দীঘি। আসামের রাজা ভগবত্ত কালাপাহাড়ের অত্যাচারে বিতাড়িত হয়ে শোলাকুড়িতে এসে এই প্রাসাদ নির্মাণ ও দীধি খনন করেন। জনশ্রুতি আছে, মাতৃভক্ত রাজা ভগবত্ত তার মায়ের ইচ্ছা পূরণের জন্য বারোটি প্রসিদ্ধ তীর্থস্থান থেকে পানি এনে মায়ের স্নানের ব্যবস্থা করতে দীঘিটি জল পূর্ণ করেছিলেন। এইজন্য দীঘিটিকে ‘বারো তীর্থের দীঘি’ বলা হয়। এই উপলক্ষে এখানে প্রতি বছর এখানে মেলা বসতো, যা এখনো ঐতিহ্যের সাথে চলছে। দীঘিটির পসচিম পাড়ে একটি প্রাচীন কূপ আছে, এই কূপের পানিতে স্নান করলে অশেষ পূণ্যলাভ হয় বলে স্থানীয় জনগণের বিশ্বাস। দীঘিটির পাড়ে দুটি প্রাচিন মন্দির রয়েছে।
মধুপুরে রয়েছে একটি সুবিশাল রাবার বাগান, যার আয়তন আট হাজার একর।
মধুপুরের প্রচুর আনারস চাষ হয়, যা দেশের সেরা আনারস হিসাবে সুখ্যাতি বয়ে এঞ্ছে মধুপুরের জন্য। এই আনারস বিদেশেও রপ্তানি হয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন